শিক্ষককে মূল্য দিন, জাতি তার ফল পাবে ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি—শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। বইয়ের পাতায়, গুরুজনদের কথায় এবং সমাজের প্রচলিত ধারণায় শিক্ষককে জাতি গঠনের কারিগর বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা কি সত্যিই সেই কারিগরদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পেরেছি? আজ যখন দেশের শিক্ষার মান নিয়ে নানা আলোচনা হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোষারোপের তীর শিক্ষকদের দিকে ছোড়া হয়। কিন্তু খুব কম মানুষই প্রশ্ন করেন—যাদের কাঁধে একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের জন্য আমরা কী করেছি? দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসমাজ তাদের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় তারা পেয়েছেন আশ্বাস, বাস্তব সমাধান নয়। কখনো কখনো এমনও মনে হয়েছে, শিক্ষকদের দাবি-দাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে তাদের সমস্যাগুলোকে আড়াল করার চেষ্টাই বেশি হয়েছে। অথচ শিক্ষকদের উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব—এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। একজন দক্ষ রাঁধুনি ছাড়া কি শুধু উন্নতমানের মসলা দিয়ে সুস্বাদু খাবার তৈরি করা সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়। একইভাবে শুধু দৃষ্টিনন্দন ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা দামি যন্ত্রপাতি দিয়ে উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন দক্ষ, অনুপ্রাণিত ও মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো শিক্ষকদের গুরুত্ব বুঝেছে বলেই শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে পেরেছে। তারা জানে, শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা একজন শিক্ষকই আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক এবং রাষ্ট্রনায়কের ভিত্তি নির্মাণ করেন। তাই শিক্ষককে সম্মান দেওয়া মানে জাতির ভবিষ্যৎকে সম্মান দেওয়া। শিক্ষা সংস্কারের শুরু হওয়া উচিত প্রাথমিক স্তর থেকে। কারণ শিশুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে ওঠে এই পর্যায়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করেন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষিত একজন তরুণের জন্য এই বেতনে পরিবার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে নিরুৎসাহিত হন। প্রশ্ন হলো, দেশের সেরা মেধাবীরা যদি শিক্ষকতা পেশায় না আসেন, তাহলে আগামী প্রজন্মকে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা কে দেবে? প্রতি বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হন। কিন্তু সীমিত চাকরির বাজারে সবাই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পান না। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করা গেলে দেশের সেরা মেধাবীদের একটি বড় অংশ এই পেশায় যুক্ত হতে পারবে। এর সুফল শুধু শিক্ষাঙ্গনে নয়, পুরো জাতি পাবে। দুঃখজনকভাবে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বা মর্যাদা বৃদ্ধির কথা উঠলেই সমাজের একটি অংশ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। যেন শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষকদের উন্নয়ন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য ব্যয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের ফল পাওয়া যায় শিক্ষিত, দক্ষ ও মানবিক নাগরিকের মাধ্যমে। আজ আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, শিক্ষকদের অবহেলা করে কোনো দেশ কখনো টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারেনি। রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। আর সেই মানবসম্পদ তৈরির মূল কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক। তাই সময় এসেছে শিক্ষকদের শুধু মুখে সম্মান জানানো নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও তাদের মর্যাদা, বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক অবস্থান উন্নত করার। কারণ শিক্ষককে মূল্য দিলে শুধু একজন ব্যক্তি লাভবান হন না; লাভবান হয় পুরো জাতি। শিক্ষককে মর্যাদা দিন, মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসবে। মেধাবীরা শিক্ষকতায় এলে শিক্ষার মান বাড়বে। আর শিক্ষার মান বাড়লে বদলে যাবে বাংলাদেশ।
সাখাওয়াত সৈকত শিক্ষক, কবি ও আবৃত্তিকার।